জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ফ্রান্সেসকা আলবানিজ সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনীকে বিশ্বের “সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ও নীতিহীন সেনাবাহিনী” (most depraved army) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-ইয়াঘির শহরে একটি ফিলিস্তিনি শিশুর ওপর ইসরায়েলি সেনাদের বর্বরোচিত নির্যাতনের একটি ভিডিও ফুটেজ সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি এই তীব্র মন্তব্য করেন।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন সেনা অত্যন্ত জোরপূর্বক ও নির্মমভাবে শিশুটিকে ধরে রেখেছে, যা শিশুটির জন্য স্পষ্টতই যন্ত্রণাদায়ক ছিল এবং অপর দুই সেনা একটি সাঁজোয়া যানের সামনে আরেক ফিলিস্তিনি শিশুকে আটকে রেখেছে। আলবানিজ বলেন, তিনি যা দেখেছেন তা পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে এই মন্তব্য করার জন্য যথেষ্ট। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ইসরায়েলি বাহিনীর এই ধরনের কর্মকাণ্ড মানবিকতার সব সীমা অতিক্রম করেছে এবং তারা পদ্ধতিগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে।
অকপটে সত্য তুলে ধরার কারণে আলবানিজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি ও একইসঙ্গে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনি “অ্যানাটমি অব আ জেনোসাইড” (Anatomy of a Genocide) শীর্ষক একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েল গাজায় ৩০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে ১৩ হাজারেরও বেশি শিশু। তিনি উপসংহারে টানেন যে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদেরকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গণহত্যার মতো অপরাধ সংঘটন করছে। ইসরায়েলি নেতৃবৃন্দের বক্তব্যকে তিনি গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন; যেমন- প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছিলেন গাজার “পুরো জাতি দায়ী”, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার জন্য বাইবেলের “আমালেক” (Amalek) প্রসঙ্গ টানেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট গাজাবাসীদের “হিউম্যান অ্যানিমেল” বা মানব-পশু বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
আলবানিজ তার প্রতিবেদনে আরও দাবি করেন যে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে (IHL) কৌশলগতভাবে “মানবিক ছদ্মবেশ” (humanitarian camouflage) হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানব ঢাল এবং ‘সেইফ জোন’-এর মতো আইনি ধারণাগুলোকে বিকৃত করে গাজার বেসামরিক জনগণ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, যার মাধ্যমে তারা তাদের গণহত্যার উদ্দেশ্যকে আড়াল করতে চাইছে। পরবর্তীতে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত “নির্যাতন ও গণহত্যা” (Torture and Genocide) শীর্ষক আরেকটি প্রতিবেদনে তিনি অভিযোগ করেন যে ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীরে একটি “নির্যাতনমূলক পরিবেশ” (torturous environment) তৈরি করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘যৌথ নির্যাতন’ (collective torture) চালাচ্ছে, যার মধ্যে অনাহারকে “সামাজিক নির্যাতন” হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
তার এই সাহসী ও স্পষ্টবাদী অবস্থানের কারণে তাকে চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে। আলবানিজ জানিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা বলার পর থেকে তার জীবন একটি অপ্রত্যাশিত “রোলার কোস্টারে” পরিণত হয়েছে। তিনি এবং তার পরিবার অনবরত প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন। একটি অজ্ঞাত ফোন কলে তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয় যে, তিউনিসিয়ায় অধ্যয়নরত তার ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করা হবে, এমনকি স্কুলটির নামও নিখুঁতভাবে উল্লেখ করা হয়। এই ভয়াবহ ঘটনা তাকে চরম আতঙ্কিত করে তোলে এবং তিনি পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিকে তিনি একটি ভয়াবহ আতঙ্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয়, জেনেভা-ভিত্তিক ইসরায়েলপন্থী কর্মীদের প্রচারণার কারণে তার স্বামী ম্যাসিমিলিয়ানো ক্যালি বিশ্বব্যাংকে সিরিয়া বিষয়ক তার প্রধান পদটি হারান। আলবানিজ বিশ্বব্যাংকের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ কাপুরুষোচিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেডি প্যান্ডরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যার মামলা করার পর ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কাছ থেকে তার এবং তার সন্তানদের বিরুদ্ধে একই ধরনের হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে।




