যাতায়াতের নিত্যদিনের ভোগান্তি ও জাইগোর উদ্ভাবন
ঢাকা শহরের নিত্যদিনের যাতায়াত ব্যবস্থা সাধারণ চাকরিজীবী ও নাগরিকদের জন্য এক অবর্ণনীয় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যাত্রাবাড়ী থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষকে বাসের প্রবল ভিড়, পকেটমারের ঝুঁকি এবং সিএনজি চালিত অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়ার মতো নিত্যনতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

বিকল্প পরিবহন হিসেবে রিকশার কথা ভাবা হলেও, সেটিও এখন আর সাধারণ মানুষের জন্য খুব একটা সস্তা উপায় নয়। ফলে যাতায়াতের এই অতিরিক্ত খরচ প্রতিদিনের জীবনে একটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা প্রায়শই লক্ষ্য করি যে, একই সময়ে একই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ যাতায়াত করেন, কিন্তু তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি বা রিকশা ব্যবহার করে থাকেন। এর ফলে যানবাহনের অনেক আসন ফাঁকা থেকে যায় এবং যাতায়াতের একক খরচের সম্পূর্ণ বোঝা একজন যাত্রীর ওপরেই বর্তায়।
এই সমস্যাগুলোর একটি স্মার্ট, যুগোপযোগী এবং সাশ্রয়ী সমাধান নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট শিক্ষার্থী) তিনজন মেধাবী তরুণ। বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং (ইউআরপি) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই তিন শিক্ষার্থী হলেন জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরশেদ এবং আবুল বাশার।
তাদের মূল ভাবনা ছিল, যদি একই সময়ে একই গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরকে কোনো একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একত্রিত করা যায়, তবে এই যাতায়াত সমস্যার একটি কার্যকরী সমাধান পাওয়া সম্ভব। এই উদ্ভাবনী চিন্তা থেকেই তারা তৈরি করেছেন উদ্ভাবনী জাইগো অ্যাপ (JyGo App), যা মূলত একটি অত্যাধুনিক ভেহিকেল পুলিং প্ল্যাটফর্ম।

যেভাবে কাজ করে জাইগো এবং ভাড়ায় সাশ্রয়-

জাইগো অ্যাপের মূল ধারণাটি অত্যন্ত সহজ এবং ব্যবহারবান্ধব। এই অ্যাপটি একই রুটে একই সময়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক যাত্রীদের একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে দেয়। এর ফলে যাত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি কিংবা রিকশায় একসাথে যাতায়াত করতে পারেন এবং মোট ভাড়ার খরচ নিজেদের মধ্যে সহজেই ভাগ করে নিতে পারেন।
জাইগোর মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো খরচ কমানো। যেখানে আগে একজন যাত্রীকে সম্পূর্ণ ভাড়া একাই বহন করতে হতো, এখন জাইগো অ্যাপের মাধ্যমে ভেহিকেল পুলিং করে দুইজন মিলে যাতায়াত করলে জনপ্রতি খরচ অন্তত ৫০ শতাংশ কমে যায়। আর যদি তিনজন যাত্রী একত্রে রাইড শেয়ার করেন, তবে জনপ্রতি যাতায়াত খরচ এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য আর্থিকভাবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে জাইগোর ভূমিকা-
যাতায়াত খরচ কমানোর পাশাপাশি রাজধানীর অন্যতম প্রধান সমস্যা ট্রাফিক জ্যাম নিরসনেও জাইগো অ্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন একই রুটে যাতায়াতের জন্য মানুষ বিপুল সংখ্যক গাড়ি ব্যবহার করছে, যা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ।
জাইগো উদ্যোক্তাদের বিশ্লেষণ মতে, ১০০ জন মানুষ যদি আলাদাভাবে ১০০টি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন, তবে যে পরিমাণ ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হয়; তারা যদি রাইড শেয়ারিং করে বের হন, তবে মাত্র ৫০টি গাড়িতেই সেই ১০০ জনের যাতায়াত সম্পন্ন করা সম্ভব। এর ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে, রাস্তার প্রচুর জায়গা ফাঁকা থাকবে এবং ট্রাফিক জ্যামের সমস্যাটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

ব্যবহারকারীদের জন্য জাইগোর আকর্ষণীয় ফিচারসমূহ-
জাইগো অ্যাপে ব্যবহারকারীদের সুবিধার জন্য দুটি প্রধান ফিচার যুক্ত করা হয়েছে: তাৎক্ষণিক রুট (Instant Route) এবং নিয়মিত রুট (Regular Route)।
- তাৎক্ষণিক রুট: তাৎক্ষণিক যাত্রার ক্ষেত্রে একজন ব্যবহারকারীকে প্রথমে অ্যাপটি ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এরপর তিনি কোথা থেকে যাত্রা শুরু করবেন এবং কোথায় যাবেন (Origin and Destination), তা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিলে অ্যাপটি তার আশেপাশের একই রুটে যেতে ইচ্ছুক ভেরিফাইড যাত্রীদের একটি তালিকা প্রদর্শন করে।
- নিয়মিত রুট: এই ফিচারটি মূলত অফিসগামী বা নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য। যারা প্রতিদিন একই পথে যাতায়াত করেন, তারা একবার এই রুট সেটআপ করে নিলে প্রতিদিন আর নতুন করে পোস্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ব্যবহারকারীরা একটি কল বা ইন-অ্যাপ মেসেজের মাধ্যমেই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে রাইড শেয়ার করতে পারেন।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা-

যেকোনো রাইড শেয়ারিং সেবায় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং জাইগো একে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
- ভেরিফাইড ইউজার ও রেটিং: যেকোনো ব্যবহারকারী রেজিস্ট্রেশন করার পর তার অ্যাকাউন্টটি যাচাই বা ভেরিফাই করার পরই কেবল অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া এখানে একটি রেটিং সিস্টেম রয়েছে। একজন যাত্রী রাইড রিকোয়েস্ট দেওয়ার পর অন্যান্য যাত্রীদের পূর্ববর্তী রাইডের রেটিং দেখতে পান এবং সেই প্রোফাইল ও রেটিং যাচাই করেই যাত্রার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
- নারীদের জন্য জেন্ডার প্রেফারেন্স: নারী যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য জাইগো অ্যাপে রয়েছে বিশেষ ‘জেন্ডার প্রেফারেন্স’ অপশন। এর মাধ্যমে নারী যাত্রীরা চাইলে শুধুমাত্র ভেরিফাইড নারী সহযাত্রীদের সাথেই রাইড শেয়ার করতে পারবেন, অন্য কারও সাথে নয়।
- জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা: জরুরি সুরক্ষার জন্য অ্যাপটিতে রয়েছে লাইভ লোকেশন শেয়ারিং, যার মাধ্যমে এক ক্লিকেই নিজের পরিচিত কন্টাক্টদের কাছে নিজের অবস্থান শেয়ার করা যায়। এছাড়া একটি ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন বাটনও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে ক্লিক করলে সরাসরি জাইগো কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি কল চলে যায়।
সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে গুগল প্লে স্টোর এবং হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারিতে জাইগো অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে আট হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং গুগল প্লে স্টোরে ১০০টিরও বেশি রিভিউ সহ এর গড় রেটিং দাঁড়ায় ৪.৬ স্টার। বর্তমানে অ্যাপটির ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার প্রায় ২০০ শতাংশ।

তবে এই নতুন উদ্যোগের কিছু সাময়িক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, বিশেষ করে তাড়াহুড়োর সময়ে একজন সহযাত্রী খুঁজে পেতে যাত্রীদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলে দ্রুততম সময়ে পার্টনার খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, জাইগো অ্যাপের উদ্যোক্তারা আশাবাদী যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তারা এই সেবাটি পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন। এছাড়া আগামী বছরে এই সেবাটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতেও সম্প্রসারণের বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় আগামী দুই মাসের মধ্যে অ্যাপটি চালুর বিষয়ে আলোচনাও চলছে।
বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িকে শুধুমাত্র এককভাবে ব্যবহারের বাইরে গিয়ে ভাগাভাগি করে ব্যবহারের এই ধারণাটি নগর পরিবহনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ঢাকার মতো একটি ব্যস্ত নগরীতে জাইগোর মতো উদ্যোগ শুধু যাতায়াতকে সহজই করছে না, বরং এটিকে অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং টেকসই করে তুলছে।



