উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন যদি কোনো বিদেশি শক্তির আঘাতে নিহত বা অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু হামলা চালানোর একটি নতুন বিধান দেশটির পারমাণবিক নীতিতে যুক্ত করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুসারে, গত ২২ মার্চ পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত উত্তর কোরিয়ার ১৫তম সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলির প্রথম অধিবেশনে এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনটি গৃহীত হয়। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএস) দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এই পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করে।
সংশোধিত এই আইনের অধীনে কিম জং উন আগের মতোই দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার পদে বহাল থাকবেন। তবে নতুন বিধানগুলোতে নেতৃত্বের ওপর কোনো ধরনের আঘাত আসলে কীভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এই সংশোধিত পারমাণবিক নীতির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি শত্রুপক্ষের কোনো হামলায় রাষ্ট্রের পারমাণবিক বাহিনীর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিপদের সম্মুখীন হয়, তবে স্বয়ংক্রিয় ও তাৎক্ষণিকভাবে পারমাণবিক হামলা চালানো হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনার পরই উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক নীতিতে এই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রেই ল্যাঙ্কভ এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে, এই ধরনের নীতি আগে থেকেই অলিখিতভাবে থাকতে পারে, তবে এবার সরাসরি সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটিকে আরও বেশি গুরুত্ব ও আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। ল্যাঙ্কভ আরও জানান, ইরানের ওই ঘটনাটি উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কতটা কার্যকর ছিল এবং কত দ্রুত ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা দেখে পিয়ংইয়ং এখন বেশ আতঙ্কিত।
তবে ইরানের সাথে উত্তর কোরিয়ার প্রেক্ষাপট মেলালে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হওয়ায় সেখানে একই ধরনের গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অনেক কঠিন।
দেশটিতে প্রবেশকারী যেকোনো বিদেশি কূটনীতিক, ত্রাণকর্মী এবং ব্যবসায়িক দর্শনার্থীদের ওপর সরকার অত্যন্ত কড়া নজরদারি বজায় রাখে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তেহরানে হ্যাক করা ট্রাফিক ক্যামেরার সাহায্যে ইরানের নেতাদের গতিবিধি অনুসরণ করেছিল।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সীমিত সিসিটিভি ব্যবস্থা এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের কারণে পিয়ংইয়ংয়ে একই ধরনের প্রযুক্তিগত কৌশল প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।
এছাড়া কিম জং উন নিজেও অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। তিনি সবসময় ভারী নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে চলাফেরা করেন এবং সাধারণত আকাশপথে ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন। তার যাতায়াতের প্রধান পছন্দ হলো ভারী সাঁজোয়া ট্রেন।
অধ্যাপক ল্যাঙ্কভ উল্লেখ করেন যে, উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো স্যাটেলাইট প্রযুক্তি থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য। কারণ যেকোনো বড় সামরিক সংঘাতের শুরুতেই যদি প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেটি যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।
এনডিটিভির সূত্রমতে, নেতৃত্ব হারানো মাত্রই এই স্বয়ংক্রিয় হামলার বিধান পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।



